শরৎকালে বাংলার প্রকৃতি কেমন হয় ?

শরৎকালে বাংলার প্রকৃতি কেমন হয় ? 

শরৎকাল হলো বাংলার ষড়ঋতুর তৃতীয় ঋতু,যা ভাদ্রও আশ্বিন এই দুই মাস নিয়ে গঠিত। শরতের আকাশ থাকে নীল এবং মেঘহীন বা তুলার মতো সাদা মেঘের ভেলায় ভরা। এসময়ে সোনাঝরা রোদ থাকে। তবে ভাদ্র মাসে মাঝেমধ্যে ইলসেগুঁড়ি বৃষ্টি বা ভ্যাপসা গরম দেখা যায়।
নদীর ধার ও চরে সাদা কাশফুল ফোটে যা এই ঋতুর অন্যতম প্রধান রূপ।

শরতের আকাশে নীল আর সাদার মায়াবি খেলা

শরতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নীল আকাশ এবং সাদা মেঘের ভেলা। বর্ষার ঘন কালো মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে দেখা দেয় সুনীল আভা। সেই নীল ক্যানভাসে ভেসে বেড়ায় পেঁজা তুলোর মতো শুভ্র সাদা মেঘ। 

এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছে কোনো অজানা উদ্দেশ্যে। আকাশের এই নীল আর সাদার খেলা মানুষের মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়।

প্রকৃতির নতুন রূপ

বর্ষা ঋতুতে বাংলাদেশ পানির নিচে ডুবে থাকে। নদী-নালা খাল-বিল সব কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। শরৎ আসার সাথে সাথে সেই পানি কমতে শুরু করে। বিলের পানি হয়ে ওঠে কাঁচের মতো স্বচ্ছ। বর্ষার ধুয়ে যাওয়া গাছপালাগুলো এই সময়ে গাঢ় সবুজ রূপ ধারণ করে। 

বাতাসে দুলতে থাকে যা কৃষকের মনে নতুন আশার আলো সঞ্চার করে। ধানের পাতার ওপর যখন ভোরের শিশিরবিন্দু পড়ে এবং তাতে সকালের সোনাঝরা রোদ প্রতিফলিত হয় তখন মনে হয় যেন মাঠজুড়ে কোটি কোটি হীরা চকচক করছে।

শিউলি ঝরা সকাল

শরতের সকালটা শুরু হয় এক অন্যরকম সুবাস নিয়ে, আর তা হলো শিউলি বা শেফালি ফুলের গন্ধ। শরতের রাতে শিউলি ফুল ফোটে এবং ভোরের আলো ফোটার আগেই তা গাছ থেকে ঝরে পড়ে। সকালে শিউলি তলায় গেলে দেখা যায় সবুজ ঘাসের উপর বিছিয়ে রয়েছে অসংখ্য সাদা কমলা রঙের ছোট ছোট শিউলি ফুল। যেন কেউ কুসুম কোমল এক গালিচা পেতে রেখেছে।

বাংলার কৃষিজীবিদের শরৎকাল

বাংলার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা কৃষিনির্ভর। শরৎকাল কৃষকদের জন্য একটি স্বস্তির সময় নিয়ে আসে। বর্ষার বন্যা বা অতিবৃষ্টির আতঙ্ক কেটে গিয়ে মাঠের ফসল পরিপক্ব হতে শুরু করে। আমন ধানের ক্ষেতে সবুজের সমারোহ দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফোটে। তারা নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। নদীগুলোতে এই সময়ে প্রচুর মাছ বিশেষ করে ইলিশ মাছ ধরা পড়ে যা জেলেদের জীবনেও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিয়ে আসে।

সংস্কৃতি ও উৎসবে শরৎকাল

শরৎ শুধু প্রকৃতির পরিবর্তনের ঋতু নয় এটি বাঙালির উৎসব ও মিলনের ঋতু। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা এই শরৎকালেই অনুষ্ঠিত হয়। আকাশে যখন চণ্ডীপাঠের সুর ভেসে বেড়ায় আর ঢাকের আওয়াজ শোনা যায় তখন প্রতিটি বাঙালির মনে দোলা দেয় উৎসবের আনন্দ। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ এই উৎসবে শামিল হয়।

শরতের জ্যোৎস্না স্নিগ্ধ রাত

শরতের দিন যেমন সুন্দর এর রাত তেমনি মায়াবী। শরতের রাতে আকাশ থাকে মেঘমুক্ত ও পরিষ্কার। এই সময়ে আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের যে রূপ দেখা যায় তা অন্য কোনো ঋতুতে সহজে দেখা যায় না। চাঁদের রুপালী আলোয় পুরো বাংলার প্রকৃতি স্নান করে। গ্রামের উঠোনে কিংবা শহরের ছাদে বসে শরতের জোছনা উপভোগ করার আনন্দই আলাদা। 

মানুষকে এক মায়াবী ও অলৌকিক জগতের অনুভূতি দেয়। গ্রামীণ কবিরা এই রাতকে কেন্দ্র করে মেতে ওঠেন পালাগান ও পুঁথিপাঠের আসরে।

শেষ কথা

শরৎকাল হলো বাংলার প্রকৃতির এক পবিত্রময় শান্ত রূপ। এটি একদিকে যেমন চোখকে জুড়িয়ে দেয় তার শুভ্র কাশফুল আর নীল আকাশ দিয়ে অন্যদিকে মানুষের মনকে করে তোলে উৎসবমুখর ও আনন্দময়। শরৎ আমাদের শেখায় কীভাবে মলিনতা দূর করে জীবনে শুভ্রতা ও পবিত্রতা আনা যায়। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও শরতের এই অপরূপ সৌন্দর্য প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক চিরন্তন শান্তির পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায়। তাই তো শরৎ বাংলার ঋতুচক্রে এক অনন্য ও অতুলনীয় ঋতুরাণী।
 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

Md.Shameem Aktar
Md.Shameem Aktar
একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও অর্ডিনারি আইটির সিনিয়র সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার। তিনি অনলাইন ইনকাম, ব্লগিং, SEO ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। ৫ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সফল হতে সহায়তা করে যাচ্ছেন।